‘জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস’ উক্তিকে জনপ্রিয় করতে প্রথমে জাগদল পরে বিএনপি’র আত্মপ্রকাশের মধ্যদিয়ে জে. জিয়াউর রহমানের রাজনীতিতে অভিষেক, ১ সেপ্টেম্বর ১৯৭৮। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ এ দলের দর্শন। ১৯ দফার মধ্যদিয়ে রাজনৈতিক কর্মসূচির শুরু এ দলের আত্মপ্রকাশের পর থেকে উপকূলবর্তী জেলা খুলনায় গত ৪৭ বছরের সফলতা ব্যর্থতা দু’টোই রয়েছে। দলে বিভিন্ন সময়ে জোয়ার ভাটা হলেও খুলনায় সাংগঠনিক ভীত শক্ত করতে সক্ষম হয় দলটি।
১৯৭৫-৭৭ অবধি দেশে সামরিক শাসন বিরাজ করে। এ প্রেক্ষাপটে সেনা প্রধান রাজনৈতিক দল গঠনে সর্বশক্তি নিয়োগ করেন। মুসলিম লীগ, ন্যাপ (ভাসানী) ও পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি (এমএল) থেকে আসা নেতা কর্মীদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠে বিএনপি নামক রাজনৈতিক দল। মূলত: পাকিস্তান সরকারের সাবেক যোগাযোগ মন্ত্রী খান এ সবুরের মৃত্যুর পর মুসলিম লীগের রাজনীতিতে ভাটা পড়লে বিএনপির পাল্লা এখানে ভারী হতে থাকে। দলের প্রথমার্ধে অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ আমীর আলী জোয়ার্দ্দার, ন্যাপ (ভাসানী) থেকে শেখ তৈয়েবুর রহমান, শ্রমিকনেতা মোঃ আশরাফ হোসেন, এম নুরুল ইসলাম, সৈয়দ ঈসা, গাজী আব্দুল বারী, এম মুনসুর আলী, জাসদ থেকে শেখ রাজ্জাক আলী, মনিরুজ্জামান মনি, পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি থেকে শফিকুল আলম মনা, অন্যান্য সংগঠন থেকে কাজী সেকেন্দার আলী ডালিম, শেখ মুজিবুর রহমান, সাহরুজ্জামান মোর্তজা, নুরুজ্জামান খোকন, রেজাউল করিম, বিএনপি ও যুবদলে যোগদান করেন। কাজী সেকেন্দার আলী ডালিম ও সৈয়দ ঈসা দলত্যাগ করলেও পরে আবার ফিরে আসেন। যদিও তাদের অবস্থান পাকাপোক্ত হয়নি। ২০০৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর বিএনপি চেয়ারপার্সন সাবেক হুইপ আশরাফ হোসেনকে দল থেকে বহিষ্কার করেন।
দলকে শক্তিশালী করার জন্য প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালের ১৯ মে থেকে ১৯৮০ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১৮ বার খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট মহাকুমা সফর করেন। তার উল্লেখযোগ্য সফরগুলো মধ্যে রয়েছে তেরখাদা, রূপসার বেলফুলিয়া, সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ, দেবহাটা, বিএল কলেজ, মোংলা ও খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিলস। তিনি ১৯৭৭ সালের ১০ এপ্রিল খুলনা শহর রক্ষা প্রকল্প, ১৯৭৯ সালের ১০ নভেম্বর এখানে কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজ, ১৯৭৮ সালের ১৪ এপ্রিল বিমান বন্দর ও ১৯৭৯ সালের ২৪ অক্টোবর খুলনা-বরিশাল সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এমএম সিটি কলেজ সরকারীকরণের প্রতিশ্রুতি দেন।
১৯৭৯ সালে আজকের বাগেরহাট-১ আসনে সৈয়দ মোজাহিদুর রহমান, একই বছর বাগেরহাট-২ আসনে এএসএম মোস্তাফিজুর রহমান, ২০০১ সালে এমএ এইচ সেলিম, ১৯৭৯ সালে বাগেরহাট-৩ আসনে আফতাব উদ্দীন হাওলাদার, খুলনা-১ আসনে ১৯৭৯ সালে প্রফুল্ল কুমার শীল, ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের ১২ জুন খুলনা-২ আসনে এ্যাড. শেখ রাজ্জাক আলী, ২০০১ সালে একই আসনে দলীয় প্রধান বেগম খালেদা জিয়া, ২০০৮ সালে নজরুল ইসলাম মঞ্জু, খুলনা-৩ আসনে ১৯৭৯, ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে মোঃ আশরাফ হোসেন, খুলনা-৪ আসনের উপ-নির্বাচনে ১৯৭৯ সালে একেএম জিয়াউদ্দিন পল্টু, ২০০১ সালে এম নুরুল ইসলাম, ১৯৭৯ সালে খুলনা-৬ আসনে এ্যাড. শেখ রাজ্জাক আলী, সাতক্ষীরা-১ আসনে ২০০১ সালে হাবিবুল ইসলাম হাবিব, ১৯৭৯ সালে সাতক্ষীরা-২ আসনে সামসুল হক, ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি সাতক্ষীরা-৩ আসনে অধ্যক্ষ আলী আহমেদ ও ১৯৭৯ সালে সাতক্ষীরা-৪ আসনে ডা. আফতাবুজ্জামান দলীয় মনোনয়নে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
জে. এরশাদের সামরিক শাসনের আওতায় ১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেয়নি। ১৯৯১ সালে খুলনা-২, খুলনা-৩ আসনে বিএনপি জয়ী হয়। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি সব ক’টি আসনে জয়ী হয়। ১৯৯৬ সালের ১২ জুন অনুষ্ঠিত খুলনা-২ আসন ছাড়া বাকি আসনগুলো হাত ছাড়া হয়। ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেয়নি। এছাড়া ২০১৮ সালের নির্বাচনে দল ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে।
যাত্রার পর থেকে উন্নয়নের দিক থেকে সফলতা ১৯৭৯ সালে কয়রা থানার আত্মপ্রকাশ, পরবর্তীতে মেডিকেল কলেজ (সোনাডাঙ্গা, জে. জিয়ার শাসনামলে) স্থাপন হয়। ১৯৯১ সালের পর থেকে কয়রা উপজেলা বিদ্যুতায়ন, কয়রা ও পাইকগাছা উপজেলায় আদালত স্থাপন, এম এম সিটি কলেজ, সুন্দরবন আদর্শ মহাবিদ্যালয়, কুয়েট, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে একাডেমিক কার্যক্রম, সবুরুন্নেছা কলেজ, কলেজিয়েট গার্লস স্কুল স্থাপন, জিয়া হল, বায়তুন নুর মসজিদ কমপ্লেক্স, নগর ভবন ও খান এ সবুর মহিলা মাদ্রাসা স্থাপন বিএনপির বড় সফলতা।
ব্যর্থতার দিক দিয়ে সবচেয়ে বড় ১৯৮০ সালে খুলনা জেলখানায় আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে একাধিক বন্দী নিহত, খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিলস, কেটিএম, হার্ডবোর্ড মিলস ও দাদা ম্যাচ ফ্যাক্টরি উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়া।
আত্মপ্রকাশের পর ১৯৭৯ সালে খুলনা ভিত্তিক রাজনীতিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান ও সংসদ সদস্য এ্যাড. শেখ রাজ্জাক আলী, সাতক্ষীরা ভিত্তিক রাজনীতিতে বস্ত্রমন্ত্রী এ্যাড. এম মুনসুর আলী ও মৎস্য প্রতিমন্ত্রী ডা. আফতাবুজ্জামানের মধ্যে দ্বন্দ্ব প্রকট ছিল। ২০০১ সালের পর খুলনা সিটি কর্পোরেশনের মেয়র এ্যাড. শেখ তৈয়বুর রহমানের সাথে তরুণ নেতা নজরুল ইসলাম মঞ্জুর বিরোধ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দুই গ্রুপ ভিন্ন ভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেয়। সাবেক স্পিকার এ্যাড. শেখ রাজ্জাক আলী ও উপ-নির্বাচনে সংসদ সদস্য মোহাম্মাদ আলি আসগর লবী সে সময় তৈয়েবুর রহমানের পক্ষে অবস্থান নেন।
এবারের নতুন কমিটি আসার আগে স্থানীয় পর্যায়ে দলের দু’গ্রুপ পৃথক পৃথক কর্মসূচি পালন করে। ঐ বছরের ডিসেম্বরে আকস্মিকভাবে নগর ও জেলা কমিটি ভেঙে দেওয়ার পর দুটি গ্রুপ প্রকাশ্যে ভিন্ন ভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেয়। তৎকালীন কমিটির নেতৃত্বে ছিলেন নগর কমিটির আহ্বায়ক এসএম শফিকুল আলম মনা ও জেলায় আমির এজাজ খান। এই অংশের নেপথ্যে রয়েছেন কেন্দ্রীয় তথ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক আজিজুল বারী হেলাল ও ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা রকিবুল ইসলাম বকুল। মহানগর বিএনপির সাবেক নেতৃবৃন্দের ব্যানারে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছেন বিলুপ্ত থানা কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকরা। এ অংশের নেপথ্যে রয়েছেন নগর শাখার সাবেক সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম মঞ্জু এবং সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক মেয়র মনিরুজ্জামান মনি।
২০২১ সালের ৯ ডিসেম্বর খুলনা মহানগর বিএনপি’র কমিটি ভেঙে দেওয়ার পর থেকেই বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে দুটি বলয় তৈরি হয়। সাবেক সভাপতি নজরুল ইসলাম মঞ্জুর নেতৃত্বে দলের বড় একটি অংশ দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থেকে সাম্প্রতিক সময়ে সক্রিয় হয়েছেন। গত কয়েক মাস ধরে কেন্দ্রীয় আহুত কর্মসূচি, দিবস পালন এবং পৃথক কার্যক্রম পালন করছেন তারা।
চার বছর আগের নগর শাখায় আহ্বায়ক শফিকুল আলম মনা, সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক তরিকুল ইসলাম জহীর, সদস্য সচিব শফিকুল আলম তুহিনসহ এই অংশের নেতারা প্রথম দিকে বেশ সফলতার সঙ্গে প্রতিটি কর্মসূচি পালন করেছেন। তবে ওয়ার্ড কমিটি গঠন নিয়ে আহ্বায়ক ও সদস্য সচিবের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয় সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক তরিকুল ইসলাম জহিরের। ২০২৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি নগর শাখার সম্মেলনে শফিকুল আলম মনা সভাপতি ও শফিকুল আলম তুহিন সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। এখনও পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন হয়নি।
বিলুপ্ত জেলা কমিটির বিএনপির আহ্বায়ক আমির এজাজ খান ও সদস্য সচিব মনিরুল হাসান বাপ্পীর সঙ্গে দূরত্ব ছিল দলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আবু হোসেন বাবু, যুবদলের সাধারণ সম্পাদক এবাদুল হক রুবায়েতসহ বড় আরেকটি অংশের। এর ফলে দলের মধ্যে বিরাজ করে অস্বস্তি-অস্থিরতা।
২০২১ সালের ৯ ডিসেম্বর জেলা বিএনপির পূর্ণাঙ্গ কমিটি ভেঙে দিয়ে ৩ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি গঠন করে দেয় কেন্দ্র। ২০২২ সালের ১ মার্চ ৬৫ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটি গত ২৪ এপ্রিল ৫টি উপজেলা ও ২টি পৌরসভায় পূর্ণাঙ্গ আহ্বায়ক কমিটি অনুমোদন দেয়। মূলত এরপর থেকেই অভ্যন্তরীণ বিরোধ বাড়তেই থাকে। ত্যাগী অনেক নেতাকর্মীকে বাদ দিয়ে এ কমিটি গঠন করা হয়। মূলত এ নিয়েই বর্তমান আহ্বায়ক ও সদস্য সচিব এবং তাদের অনুসারীদের সঙ্গে অন্যদের দূরত্ব তৈরি হয়। ২০১৪-২০১৮ ও ২০২৪ সালে জাতীয় নির্বাচন একতরফা, ভোট ডাকাতি ও রাতের ভোট হলেও সাংগঠনিকভাবে প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়নি। মেয়র পদে নজরুল ইসলাম মঞ্জুকে জোরপূর্বক হারানো হলেও দলীয়ভাবে প্রতিরোধ গড়ে ওঠেনি। স্বৈরশাসন আমলে প্রায় ৪শ’ গায়েবি মামলায় হাজার হাজার নেতা-কর্মী হয়রানির শিকার হয়েছে। এমনকি ফুলতলায় দলীয় প্রধান বেগম খালেদা জিয়ার নামেও মামলা হয়।
জেলা বিএনপির সদস্য সচিব আবু হোসেন বাবু বলেন, কমিটিসহ বেশকিছু বিষয়ে মতপার্থক্য ছিল। একটি অনাকাক্সিক্ষত ঘটনাও ঘটে। সেটা কেন্দ্রীয় নেতা আজিজুল বারী হেলাল ও রকিবুল ইসলাম বকুল সমস্যার সমাধান করেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর ১৯ সেপ্টেম্বর জেলা কমিটি কেন্দ্রের নির্দেশে বিলুপ্ত হয়। ১৩ ডিসেম্বর সাবেক ছাত্রনেতা মনিরুজ্জামান মন্টুকে আহ্বায়ক, এড. মোঃ মোমরেজুল ইসলামকে যুগ্ম আহ্বায়ক ও সাবেক ছাত্রনেতা শেখ আবু হোসেন বাবুকে সদস্য সচিব করে জেলা কমিটি গঠন করা হয়। জেলা নেতাদের তৃণমূল পর্যায়ে বিরোধ মীমাংসা করতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে। কয়রা উপজেলা কমিটি বিলুপ্ত হয়েছে। দখলদারিত্ব ও চাঁদাবাজির জন্য একাধিক নেতা কর্মী দল থেকে বহিষ্কার হয়েছে। সদর থানা বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক মোল্লা ফরিদ আহমেদকে নিয়ে সংগঠন বড় বিপাকে পড়েছে। তিনি গণমাধ্যমে নেতিবাচক শিরোনাম হয়েছেন।
২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে খুলনা-১ আসন থেকে আমির এজাজ খান নির্বাচিত হন। ১৯৭৯ সালের এ আসন বিএনপি উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। খুলনা -৩ আসন থেকে রকিবুল ইসলাম বকুল, খুলনা-৪ আসন থেকে আজিজুল বারী হেলাল ও খুলনা-৫ আসন থেকে মোহাম্মাদ আলি আজগর লবি নির্বাচিত হন। দলের দুর্গ বলে খ্যাত খুলনা-২ আসন হাত ছাড়া হয়ে যায়। এ জন্য দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলকে দায়ী করা হয়। পতিত সরকারের সমর্থকরা বিএনপিকে পরাজিত করতে নীরবে নিভৃতে কাজ করে। নিষিদ্ধ ঘোষিত দলের ভোটাররা তাদের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বিদের সমর্থন জানায়। সরকার গঠনের পর বিষয়টি স্পষ্ট হয়। তাদের পুনর্বাসিত করতে এবং কেসিসি নির্বাচনে সমর্থন জানাতে সুসম্পর্ক অব্যাহত রেখেছে। ৫ আগস্টের পর থেকে মাঠে ময়দানে শেখ পরিবার ও নিষিদ্ধ ঘোষিত দলের চিহ্নিত লুটেরাদের বিরুদ্ধে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বিদের কণ্ঠস্বর সোচ্চার ছিল না।
খুলনা গেজেট/এনএম

